
ফাইজা রহমান অনু, নেত্রকোণা।
ফজরের আজানের স্নিগ্ধতায় যখন শহর জেগে ওঠে, তখন সেই পবিত্র মুহূর্তটি নিথর হয়ে গেল একটি বুলেটের শব্দে। মসজিদের গেটে লুটিয়ে পড়লেন আমাদের সবার প্রিয় ওসমান হাদী ভাই। তাকে আমরা দেখেছি রাজপথে, অলিতে-গলিতে সাধারণ ও অসহায় মানুষের পাশে। নির্বাচনে প্রচলনায় তিনি সাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে দোয়া চেয়েছেন; কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায়—তার সারল্য আর জনসেবা ছিল নজরকাড়া। কিন্তু সেই জনপ্রিয় মানুষটিকে কেন আজ কবরে শুতে হলো? ১২ ডিসেম্বর তাকে রাজপথে প্রথম গুলি করা হয়েছিল। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার রক্ত আমাদের বিবেককে এক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
**১. কথিত স্বাধীনতা বনাম বুলেটের শাসন:**
আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? ওসমান হাদী ভাইয়ের রক্ত আবারো প্রমাণ করে দিল যে, দেশ স্বাধীন হলেও এ দেশের সাধারণ মানুষ আজো পরাধীন। এই দেশে এখনো মুখ খুললেই বুলেট দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়ার নোংরা সংস্কৃতি বজায় আছে। সত্য বললে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে যদি প্রাণ দিতে হয়, তবে এই স্বাধীনতার অর্থ কী? আমার ভাই আজ কবরের অন্ধকারে শুয়ে আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—তার খুনি কেন এখনো দেশের ওপারে? এই পলায়ন কি প্রমাণ করে না যে আমাদের আইন ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর এবং পক্ষপাতদুষ্ট?
কয়দিন পরেই হাদিকে মনের একপাশে ফেলে রাখবো আমরা। কত মানুষই তো ম/রে যায়। কয়জনকেই বা মনে রাখি? মাঝেমধ্যে, বছরান্তে স্মরণ, এইটুকুই তো। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষটার মা বাপ ভাই বোন বউ সন্তান? একমাত্র তারাই কষ্টটা বয়ে বেড়াবে আজীবন।আর আমরা দেশে কয়দিন মানববন্ধন, আন্দোলন আর ফেসবুক পর্যন্তই সীমাবদ্ধতা চলবে এরপর আরেকটা নতুন ইস্যু এসে ধামাচাপা দিয়ে দিবে।হে এটাই অন্ধের দেশ এই দেশে পশু মারার বিচার হয় কিন্তু একটা মানুষের লাশ খুবই নগন্য সস্তা যার মূল্য, নিউজপেপার,মিডিয়া আর কয়েকদিনের মানববন্ধন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।
সুপরিকল্পিত নীল নকশা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া:
অভিযোগ উঠেছে, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছাত্রলীগের এক নেতা, যাকে আড়াল থেকে সাহায্য করেছে প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি। এটাই আমাদের দেশের নিষ্ঠুর বাস্তবতা যে, বড় কোনো শক্তির মদদ ছাড়া একজন খুনি দিনে-দুপুরে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অনায়াসে সীমান্ত পার হতে পারে না। যে প্রশাসন ও রাজনৈতিক শক্তি এই খুনিকে দেশত্যাগে সাহায্য করেছে, তাদের হাতও হাদী ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত।
মব জাস্টিস ও লাশ নিয়ে নোংরা খেলা: সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো বর্তমানের ‘মব জাস্টিস’। আজ যারা ভাঙচুর আর বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, তাদের কাছে আমার সবিনয় প্রশ্ন—১২ ডিসেম্বর যখন হাদী ভাইকে প্রথম গুলি করা হয়েছিল, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? সেদিন থেকে কেন অপরাধীর শাস্তির দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত হলো না? আপনারা কি তবে তার মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন? আজ তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশ অস্থিতিশীল করা হচ্ছে, যা আসলে পরাজিত ফ্যাসিবাদীদের পথকেই প্রশস্ত করে দিচ্ছে। এই মবকারীরা আদতে দেশ বা হাদী ভাই কাউকে ভালোবাসে না; তাদের মূল লক্ষ্য অরাজকতা সৃষ্টি করা।
৩৬ জুলাইয়ের অঙ্গীকার ও ইনসাফের রাষ্ট্র গঠন: ৩৬ জুলাই ২০২৪-এর বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। সেই বিপ্লবের সকল অসমাপ্ত কাজ আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে পূরণ করতে হবে। একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নেওয়া আজ সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, কেউ যেন কোনো উস্কানিতে পড়ে ভুল পদক্ষেপে পা না দেই। এবার আর ভুল করলে আপনি, আমি বা আমরা—কেউই বাঁচবো না। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে না।
আইনের সংস্কার ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা:**
আইন যদি নিরপেক্ষ ও শক্ত হতো, তবে অপরাধীরা সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ পেত না। গুম, খুন আর ধর্ষণের বিচারহীনতা আজ অপরাধীদের অভয়ারণ্য করে তুলেছে। আমার ভাই কবরে আর খুনি কেন সীমানার ওপারে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।

আমাদের দাবি ও প্রস্তাবনা: সুশৃঙখল রাষ্ট্র গঠন:** ৩৬ জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়বিচার সম্পন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। খুনিকে প্রত্যর্পণ: পালিয়ে থাকা খুনিকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দ্রুত ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করা। আইন সংস্কার: মুখ খুললেই গুলি করার এই সংস্কৃতি বন্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
ওসমান হাদী ভাইয়ের রক্ত আমাদের বিচার ব্যবস্থার মুখে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে, খুনিদের আড়াল করা বা মৃত্যুকে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা—উভয়ই সমান অপরাধ। আমরা লাশ নয়, আমরা ইনসাফ চাই। আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে—এই ক্ষোভ আজ বাংলার আকাশে-বাতাসে।

