
জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা বিলুপ্ত করে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন দ্বিতীয় দফায় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত করা হয়েছে সংশোধিত অধ্যাদেশের খসড়া। আগামী সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে খসড়া অধ্যাদেশটি। যেহেতু দেশের সব নাগরিক যেন আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, এটাই এর চূড়ান্ত লক্ষ্য, ফলে আমরা উদ্যোগটির সফলতা কামনা করি।
এর আগে ২০০০ সালে আর্থিক সংকটের কারণে যেন নাগরিকরা আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে সমতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, এজন্য ‘আইনগত সহায়তা প্রদান’ আইন করা হয়। ২০০৯ থেকে গত মার্চ পর্যন্ত এ সংস্থায় প্রায় ১২ লাখ অসচ্ছল বিচারপ্রার্থী বিনামূল্যে আইনি সেবা নেন। সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস, দেশের ৬৪ জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেল, সরকারি আইনি সহায়তায় জাতীয় হেল্পলাইন কলসেন্টারে (টোল ফ্রি-‘১৬৪৩০’) মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হয়। এ সময়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আড়াইশ কোটি টাকার বেশি আদায় করে বিচারপ্রার্থীদের দিয়েছে জেলা লিগ্যাল অফিসগুলো। আইনের ২১ক ধারা অনুসারে, সারা দেশে লিগ্যাল এইড অফিসার বিকল্প পদ্ধতিতে প্রচলিত আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। আইনি পরামর্শ প্রদান করেন আইনি সেবাপ্রত্যাশীদের। আইনের অধীনে থেকে পরিচালনা করেন লিগ্যাল এইড অফিসার ‘মধ্যস্থতা কার্যক্রম’। দুপক্ষের সম্মতি ও সমঝোতায় মধ্যস্থতা চুক্তি সম্পাদন করে থাকেন আইনি প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়ায় বিরোধ নিষ্পত্তিতে মিলছে সুফল। সাশ্রয় হচ্ছে অর্থ-সময়। বর্তমানে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, তা তিনগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১ জুলাই আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে নয়টি আইনের (দেওয়ানি পাঁচটি ও ফৌজদারি চারটি) বিরোধ ও অভিযোগে প্রচলিত আদালতে মামলা দায়েরের আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
দেশে মামলা জটের চরম অবস্থার কথা সবারই জানা। জানা যায়, বর্তমানে সারা দেশে ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। বিদ্যমান মামলার সঙ্গে প্রতিনিয়ত নতুন দায়েরকৃত মামলা যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে মামলার সংখ্যানুপাতে বিচারকের সংখ্যাও অপ্রতুল। এ অবস্থায় যেসব বিরোধ আপসযোগ্য অথবা সমঝোতায় দ্রুত এবং সহজে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেসব বিরোধ বা অভিযোগ চিহ্নিতক্রমে মামলার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গেলে বিচারপ্রার্থীরা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি ব্যয় হ্রাস পাবে রাষ্ট্রের।
আমরা মনে করি, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে কোনো ধরনের সেবা সহজ ও সাশ্রয়ে প্রাপ্তির। আমাদের মতো দেশে সেটা যদি হয় সরকারি উদ্যোগে আইনি সহায়তার মতো সেবা, তা নিঃসন্দেহে জনকল্যাণকর। কেননা, দেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময়ের যে বাস্তবতা অদ্যাবধি বিরাজমান, তা আজও পুরোপুরি জনবান্ধব হয়ে ওঠেনি। মামলা, বিচার-আচারের কথা এলেই আমাদের মনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা শঙ্কার চিত্র ভেসে ওঠে। এর পেছনে অবশ্য এ বিভাগের নানা রকমের বাস্তবিক দিকও রয়েছে। সে যাই হোক, উল্লিখিত বিকল্প উদ্যোগের মাধ্যমে যদি দেশের সর্বস্তরের মানুষের আইনি সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটাই হবে পদক্ষেপটির সার্থকতা। আমাদের প্রত্যাশা, এর মধ্য দিয়ে জনমুখী বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।


