রাজধানী ঢাকার কড়াইল বস্তিতে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে প্রায় দেড় হাজার ঘর পুড়ে হয়েছে ছাই। এ সম্পাদকীয় লেখার সময় পর্যন্ত হতাহতের কথা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও কড়াইলের বাতাস ছিল ভারী। শেষ সম্বল মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে সর্বস্বান্ত বস্তিবাসীর আহাজারি তখনো থামেনি। নিঃশেষ হয়নি ছাইপোড়া গন্ধ।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার কথা জানানো হয়। জানা যায়, বউবাজারের কুমিল্লাপট্টি, বরিশালপট্টি ও ‘ক’ ব্লক এলাকায় আগুন লাগে। ওই অংশে হাজারখানেক ঘর ছিল। আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার অধিকাংশ ঘটনার মতোই এ ঘটনায়ও ভুক্তভোগীরা ফায়ার সার্ভিসের দেরি করে পৌঁছানো এবং আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফায়ার সার্ভিস থেকে বলা হয়, তীব্র বাতাস, সরু রাস্তা মাড়িয়ে গাড়ি পৌঁছাতে না পারা ও পানির অভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। তাই নিয়ন্ত্রণে নিতে সময় লাগে।
বলা বাহুল্য, ঢাকার বাস্তবতায় যেসব জায়গায় আগুন লাগে সেসব স্থানে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পৌঁছাতে বেগ পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রত্যেক ঘটনায় দুঃখজনক এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এসবই অপরিকল্পিত নগরীর সাক্ষ্য বহন করে। পাশাপাশি আগুন নেভানোর জন্য আরেকটি অন্তরায় বা ঘাটতি দেখা যায় কাছাকাছি পানির সহজপ্রাপ্যতা। অবশ্য কড়াইল বস্তির পাশে পানির আধার থাকা সত্ত্বেও তা ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এর বাইরেও উৎসুক কিংবা উদ্ধারের মানসিকতা নিয়ে আসা জনতাও এসব ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম বাধাহীন করতে প্রতিবন্ধক হতে দেখা যায়।
কড়াইল বস্তির একপাশে গুলশান। অন্যপাশে বনানীর মতো অভিজাত এলাকা। প্রায় ৯০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এ বস্তিতে অন্তত ১০ হাজার ঘর। দেখা যায়, মাঝেমধ্যেই এখানে আগুন লাগে। চলতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি, গত বছর ১৮ ডিসেম্বর ও ২৪ মার্চ পুড়ে যায় বেশ কিছু ঘর। প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন এ বস্তিতে আগুন লাগে? অবশ্য কীভাবে ঘটে, তার প্রকৃত কারণ নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন উঠতে দেখা গেছে। আবার কিছুদিন বেশ আলোচনা চললেও তা সহসা হারিয়েও যায়। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা পরিবর্তনের কিছু দৃশ্যমান হয় না। আবার দেখা যাবে, কোনো একদিন কড়াইলের বস্তিতে আগুন! পত্রিকায় বেদনার্ত সব শিরোনাম। প্রশ্ন হচ্ছে—এ আবর্ত কি চলতেই থাকবে?
আমরা মনে করি, কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী একদিকে যেমন অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা; একইভাবে দায়ী বারবার এসব ঘটনার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া। স্মরণে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক তার জানমালের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে। তার সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, নাগরিক হিসেবেই সমান অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রশ্ন ওঠে, কড়াইল বস্তিবাসীর আহাজারি কি সরকারগুলোর তরফ থেকে অপেক্ষাকৃত কম মনোযোগ পায়? আমাদের প্রত্যাশা, এ ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে। সুষ্ঠু তদন্ত হবে আগুন লাগার সূত্রপাত নিয়ে। পাশাপাশি একই ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা আন্তরিকভাবে ভাববে।